সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
দুর্ধর্ষ, অসীম সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বপ্নদর্শী বাঙালি ও বাংলাদেশিদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের নাম ‘অখণ্ড বৃহত্তর বাংলাদেশ আন্দোলন’সংক্ষেপে যা ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’নামে পরিচিত। একটি কাঙ্ক্ষিত মানচিত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ না পাওয়ার বেদনা থেকে এবং বাংলা বলয়ের সকল বাংলাভাষীর জন্য একটি বৈষম্যহীন ‘অখণ্ড বৃহত্তর বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে বাংলা ১৪০৫ সনের ১লা পৌষ, বুধবার (গ্রেগরিয়ান ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আমতলা থেকে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। ১৪১০ সনের ১লা পৌষ, মঙ্গলবার (২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর) পূর্ব লন্ডনের‘ইস্ট ইন্ডিয়া ডক’ থেকে যুক্তরাজ্যে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে বাংলাদেশের সাথে অন্তর্ভূক্ত করে ‘অখণ্ড বৃহত্তর বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে আন্দোলনে নেমেছে সংগঠনটি। বাংলার যে অংশগুলো ইন্ডিয়া আর মিয়ানমার দখল করে রেখেছে, সংগঠনটি সেই অংশগুলো সসন্মানে ফেরত চাইছে। ইন্ডিয়ার কাছে ইন্ডিয়ার দখলে থাকা পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যাণ্ড, অরুণাচল, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, আন্দামান এবং ছত্তিশগড়ের কিছু অংশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অংশ ফেরত চাইছে। মিয়ানমারের কাছে মিয়ানমারের দখলে থাকা আরাকান, শান ও কাচিনের কিছু অংশ ফেরত চাইছে। নব্বইয়ের দশক থেকে সংগঠনটি শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ’র বাংলা, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’র বাংলা ফেরত পেতে আন্দোলন করছে। দাবি আদায় করার জন্য সংগঠনটি সহিংস হওয়ার কোনো আহবান জানাচ্ছে না। কোন রক্তপাত চাইছে না। দিল্লি ও মিয়ানমারের শাসকদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করছে না। কোন রক্তপাত চাইছে না। সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতে দখলে রাখা বাংলার অন্য অংশগুলো ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করছে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্তনের কথা বলছে। কাঙ্ক্ষিত মানচিত্র পাওয়ার জন্য, বাংলাদেশের মানচিত্র পূর্ণ করার জন্য সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আওতায় থেকে সংগঠনটি একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ গণভোটের আয়োজন করে ইন্ডিয়া ও মিয়ানমারের শাসকদের কাছে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করছে। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি নিজ দেশের পাশাপাশি বিদেশেও জনমত গড়ে তুলছে। প্রাথমিকভাবে সংগঠনটির পরিকল্পনা ছিলো নীরবে কাজ করে যাওয়া এবং জনমত সংগঠিত করা। জনমত সংগঠিত হয়ে গেলে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, আরাকান, শান ও আন্দামানসহ সারাবিশ্বে একযোগে একইদিনে, একই সময়ে আত্মপ্রকাশ করা। কিন্তু ১৪৩০ সনের জ্যৈষ্ঠ মাসে (গ্রেগরিয়ান ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে) ইন্ডিয়া তাদের নতুন সংসদ ভবনের ম্যুরালে বাংলাদেশকে অংশ করে ‘অখণ্ড ভারত’মানচিত্র প্রকাশ করে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ভেবেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি মানচিত্রটি অপসারণের দাবি জানানো হবে। বলা হবে, ইতিহাসে ‘অখণ্ড ভারত’ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। অখণ্ড ভারত তো দূরের কথা বাংলার ইতিহাসে ভারত নামক কোন শব্দ নেই। দিল্লি’র শাসকদের কল্পিত মানচিত্রে বাংলাদেশকে অখণ্ড ভারতের অংশ দেখানো অত্যন্ত আপত্তিকর। এটি বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এটি বাংলাদেশকে অস্বীকারের শামিল। কিন্তু, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব কিছুই করা হয়নি, কিছুই বলা হয়নি। এমনকি ক্ষমতাসীন দলও বিষয়টাতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে সংগঠনটিকে নীরবে কাজ করে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ১৪৩০ সনের ৯ আষাঢ়, শুক্রবার (২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন) ঐতিহাসিক পলাশী দিবসে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ইন্ডিয়ার নতুন সংসদ ভবনের ম্যুরালে বাংলাদেশকে যুক্ত করে ‘অখণ্ড ভারত’ মানচিত্র স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করতে হয়েছে। এভাবেই সময়ের প্রয়োজনে তড়িঘড়ি সংগঠনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছে। এরপর থেকে নিয়মিত সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক নানান কার্যক্রম চলছে। ১৪৩১ সনের ৯ আষাঢ়, রবিবার (২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন) পলাশী শঠতা ও প্রহসনের বিয়োগান্তক ইতিহাসের ২৬৭ বছর পর অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলনের উদ্যোগে “পলাশী টু ওয়েস্টমিনস্টার” শিরোনামে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে ইতিহাসে প্রথমবারের মত পলাশী দিবস পালিত হয়েছে এবং প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে সংগঠনটি বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান আগ্রাসন, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও আগরতলায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের অভ্যন্তরে হামলা, ভাঙচুর এবং দেশের পতাকা অবমাননার ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের সামনে অনুষ্ঠিত সেই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দিল্লি’র শাসকদের কাছে ১০ দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে লন্ডনে ইন্ডিয়ান হাইকমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে। সংগঠনটি বাংলাদেশিদের নিয়ে ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও শিষ্টাচার বহির্ভূত বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইন্ডিয়ার শাসকদেরকে তাদের দেশের সীমানা বিহারের কুশি নদীর তীর পর্যন্ত ফিরিয়ে নিতে বলেছে। মিয়ানমারের শাসকদেরকে বাংলার অংশগুলো ফিরিয়ে দিতে বলছে। ইন্ডিয়া ও মিয়ানমারের শাসকদের কাছে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ’র বাংলা ফেরত চাইছে, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’র বাংলা ফেরত চাইছে। যা বর্তমানে ইন্ডিয়ায় ও মিয়ানমারে খুবই আলোচিত হচ্ছে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, আন্দামান থেকে আরাকান, আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার থেকে উড়িষ্যা পর্যন্ত এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। যতই দিন যাচ্ছে আন্দোলন ততই বেগবান হচ্ছে। ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’ এখন দেশের রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। ১৪৩১ সনের ১লা পৌষ, সোমবার (২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর) ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’ যুক্তরাজ্যে ২১ বছর এবং বাংলাদেশে ২৬ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেছে। যতদিন তাদের দাবি পুরণ না হবে, ততদিন সংগঠনটি শান্তিপূর্ণভাবে এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ১৪২৬ সনের ২১ আশ্বিন, রবিবার (২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর) রাতে অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন এর অঙ্গ সংগঠন অখণ্ড বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ইন্ডিয়াকে মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার ও বাংলাদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করার সমালোচনা করায় এবং ইন্ডিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন অসম চুক্তির অসঙ্গতি তুলে ধরায় শেরেবাংলা আবাসিক হলে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সেই থেকে সংগঠনটি আবরার ফাহাদকে ‘অখণ্ড বৃহত্তর বাংলাদেশ আন্দোলন’ এর প্রথম শহিদ হিসেবে উল্লেখ করে ফেনী নদীর নাম ‘শহিদ আবরার ফাহাদ নদী’ রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের পক্ষে বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও নানান কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনটি দীর্ঘ দিন ধরে জনমত তৈরির কাজ করছে। এই আন্দোলনের কর্মীরা পলাশী ও বঙ্গভঙ্গের মত ঐতিহাসিক বিভাজনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, আরাকান, শান, আন্দামানসহ ছত্তিশগড় ও অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অংশ, এই বৃহত্তর অঞ্চলকে একটি স্বাধীন, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে রূপান্তরের কথা বলছে। তাঁরা সুলতানি ও নবাবী আমলের বাংলার ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। এই আন্দোলনটি মূলত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলা বলয় তৈরির আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও ঐতিহাসিক মানচিত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করছে। সময়ের পরিক্রমায় অখণ্ড বৃহত্তর বাংলাদেশ আন্দোলন আজ স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের মূলধারার একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি বা মূল প্রতিপাদ্য হলো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সংহত করা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দৃঢ়মূল ভিত্তি প্রদান ও সকল বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং ঔপনিবেশিক আমলের ঘুণেধরা আর্থ-সামাজিক-প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন করে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘নবাবী বাংলা’র পুনর্প্রতিষ্ঠা, যা ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের মতো সাম্প্রদায়িক বিভাজন থেকে মুক্ত হবে।
